পারস্পরিক
অংশ ১
এখন আমি শুয়ে আছি বালুর ওপরে, বালুগুলি একটু ভেজা ভেজা, সমুদ্রের পাশের বালু, মাজে মধ্যে স্যাঁতস্যাঁতে লাগে ।
আমার পাশে আকাশের দিকে মুখ করে ঘুমুচ্ছে নাদুস-নুদুস একটি বালিকা, নাম তনুশ্রী!
নামের সাথে মেয়েটাকে বেশ মানায়!
তনু মানে দেহ, আর শ্রী মানে
সৌন্দর্য ! তার মনটাও সুন্দর, ভাবছি সে ঘুম থেকে
উঠলে তাকে মনশ্রী বলে ডাকব !
আমার হাত ওর হাতের ভেতর
- ওর হাত আমার হাতের ভেতর !
তাই হাত বারবার ঘামিয়ে যাচ্ছে,
কিন্তু সমুদ্রের বাতাস আবার হাত শুঁকিয়ে দিচ্ছে,
আবারও হাত ভিজে যাচ্ছে ঘামে,
সমুদ্রের বাতাস আবার তা শুঁকিয়ে দিচ্ছে!
এই শুঁকনো
এই ভেজা
বাহ, দারুণ ব্যাপার তো! তনুশ্রী জেগে থাকলে এই দারুণ আবেগটি
অনুভব করতে পারত!
কিন্তু সাথে সাথে আবার মনে হল কিছু কিছু
মুহুর্ত একা একা অনুভব করতে হয় ! এমনকি যার কারণে এই ধরণের অনুভূতি
হয় তাকেও জানানো যায় না !
তাই এই মুহূর্তটা আমি
একা একা অনুভব করব ! তনুশ্রীকে দেব না অনুভব করতে
! ঘুমাক মেয়েটা ।
অংশ ২
সকাল বিদায় নিয়ে দুপুর বেড়াতে এল আমাদের কাছে
! সমুদ্রের বাতাসের সাথে রোদের আরামদায়ক উষ্ণতা যুক্ত হল!
এখনের অনুভূতি হচ্ছে -
এই গরম - এই
শীতল
কারণ -
হঠাৎ করেই বাতাস সমুদ্র থেকে গভীর শীতলতা নিয়ে আসে -
তাতে মিশে থাকে -
সাগরের ঢেউ এর আওয়াজ,
মাছদের গুণগুণ করে গাওয়া গান,
জেলেদের মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা,
ভুল করে সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়ার কাহিনী,
কেউ হয়তোবা সাগরের দিকে তাকিয়ে কষ্টের কিছু ভাবছে - তার গল্প,
জাহাজ ডুবে যাওয়ার কষ্ট,
তারপর মানুষের চিৎকার,
হয়তোবা, সমুদ্র যুদ্ধে বিজয়ী মানুষের চিৎকার,
হয়তোবা, সমুদ্র যুদ্ধে হেরে যাওয়া মানুষের আর্তনাদ,
হয়তোবা, আরও অনেক অনেক কিছু যা কিনা এক
সমুদ্রে থাকা সম্ভব ও নয় !
আমাদের ওপর নীল আকাশ থাকার কথা, কিন্তু আছে সবুজ আকাশ !
কারণ আমরা দুজন বিশাল বিশাল গাছের নীচে! গাছগুলি এতটাই বড় যে আকাশ
ঢেকে গেছে !
আমাদের ওপর সবুজ গাছের আকাশ,
গাছের ওপর নীল আকাশের আকাশ,
আকাশের ওপর কমলা সূর্য,
আর এই সূর্য
থেকে আমাদের কাছে আলো আসছে,
এই আলোকে দেখে
মনে হচ্ছে সে বেশ হাঁপিয়ে
উঠেছে! আর উঠবেই বা
না কেন?!
যত্ত গাছের পাতা আছে - সবকটিকে অতিক্রম করে আসতে হয়েছে বেচারা আলোকে আমদের কাছে, আমাদের তাপ দিতে!
এই ক্লান্ত সূর্যের
আলোতেও আমাদের হাতের ঘাম শুকিয়ে যাচ্ছে!
এমন পরিবেশে আমরা একে অপরের হাত মুঠিতে ধরে চুপচাপ রইলাম, আর সমুদ্রের নিয়ে
আসা গল্প শুনতে থাকলাম, তনুশ্রী অবশ্য শুনছিল না ! সে এখনো ঘুমিয়ে
!
এতে করে আমার আরামই হচ্ছে, অনেকক্ষণ ধরে ওর হাতটি নিজের
মুঠিতে ভরে রাখতে পারছি !
সে জেগে থাকলে
হাত ধরতেই দিত না, তখন নিজের হাতকে নিজের মুঠিতে ভরে রেখে দিত, আমাকে তা স্পর্শও করতে
দিত না ! তবে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসত, আর হাসিটার অর্থ
আমার কাছে অনেকটা এমন -
"হাত ধরতে চাইলে চাইতে পার, কিন্তু আমি দিব না, তবে আমার ও খুব মন
চাচ্ছে, কিন্তু আমি দেব না"
অংশ ৩
এখন বিকেল, রোদ নেই, সমুদ্র আস্তে আস্তে গল্প শোনাচ্ছে!
আমি একা একা শুনছি, আমার আশেপাশে অনেক মানুষ আছে ! সবচেয়ে কাছে তনুশ্রী, সে ঘুমুচ্ছে, আর
বাকি মানুষগুলোও ঘুমুচ্ছে ! তবে এদের সবার ঘুম চিরতরের, আর তনুশ্রীর ঘুম
সাময়িক !
গতকাল ঠিক সেই সময় আমাদের জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল -
যখন সূর্য বিদায় নেয়
দিন বিদায় নেয়
যখন রাত চাঁদসহ অনেক তারাকে নিয়ে পৃথিবীতে বেড়াতে আসে, সূর্যকে বিশ্রাম দিতে এক রাতের জন্য
!
ঠিক তখনই ডুবে গিয়েছিল আমাদের জাহাজ !
জাহাজে অনেক মানুষই ছিল, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ
সাঁতার কাটতে পারেনি আর বাকি ৩০
শতাংশ মানুষ এখন ডাঙ্গায় ! যেখানে জাহাজ ডুবে গিয়েছিল সেখান থেকে এই ডাঙ্গায় আসতে
প্রায় ৩ ঘণ্টা লেগেছে
! যারা সাঁতরাতে পেরেছে তারা এখন এখানে, তাদের মধ্যে আমি আর তনুশ্রীও আছি!
সবাই কাহিল সাঁতার কেটে,
তাই সারাজীবনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে,
তনুশ্রী কম কাহিল বলে
সাময়িক ঘুমিয়ে নিচ্ছে,
তাকে একটি লাইফবোট জোগাড় করে দিয়েছিলাম জাহাজ ডোবার আগে,
তাই সে অন্যদের তুলনায়
একটু সহজেই সাঁতরাতে পেরেছিল !
আর আমি ?
আমি মোটেও কাহিল নই,
তনুশ্রী আমার হাত ধরে এই ডাঙ্গায় টেনে
এনেছে !
কারণ আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম জাহাজ ডোবার পর ।
আমাকে বলতেই হবে, মেয়েটার তনু-তে শ্রী থাকার
পাশাপাশি বল ও আছে
!
বেশ ভাল !
তনুশ্রী না থাকলে আমি
আজ আর বেঁচেই থাকতাম
না, সমুদ্রের গভীরে হারিয়ে যেতাম, হয়তো কোন বিশাল মাছের পেটে হজম হতে থাকতাম !
আমার আশেপাশের মানুষগুলির মধ্যে সবাই ঘুমুচ্ছে, নিঃশব্দে ! আর কখনই জেগে
উঠবে না !
তনুশ্রী ও ঘুমিয়েছে, তবে
খুব অল্প সময়ের জন্য, কিছুক্ষণ পরেই জেগে উঠবে !
আমি একা, আবার একা নই !
আশেপাশে অনেক মানুষ থাকলেও তারা কেউই জীবিত নেই !
আশেপাশে অনেক মানুষ আছে প্রাণ নেই তবুও !
এখন ?
আমার মধ্যে জেগে থাকার শক্তিটুকু আছে, আর কিছু নেই
!
তনুশ্রীর মধ্যে ঘুমিয়ে থাকার শক্তিটুকু আছে, আর কিছু নেই
!
অংশ ৪
রাত হয়ে আসছে, আজ এই দ্বীপে
আমাদের সবার ২য় রাত আর
আমার একার ১ম রাত !
কারণ, কাল যদিও সবাই জেগে ছিল, কিন্তু আজ ঘুমিয়ে চিরতরে
!
রাতের দিকে কিছু হিংস্র প্রাণির শরীর হিম করা করুণ সুর শুনতে পাওয়া যায় ! আওয়াজ শুনেই বোঝা যায় যে তারা প্রচণ্ড
হিংস্র, শিকারের খোঁজ পাওয়া মাত্রই ছুটে এসে ছিঁড়ে-ছুঁড়ে সাবাড় করে ফেলবে সব !
গতকাল সবাই ছিল বলে কোন হিংস্র প্রানিগুলি এদিকটায় আসেনি, দূরে থেকে শব্দ করেছে, কিন্তু আজ মনে হয়
তারা দল বেঁধে আসবে,
কারণ তারা বুঝে ফেলেছে যে সবাই আজ
এই সময়ে ঘুমিয়ে, চিরতরে ঘুমিয়ে ! ঘুমন্ত মানুষকে খুব সহজেই ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়া যায় কারণ তারা নড়াচড়া করে না ।
আমি চোখ বন্ধ করে আছি, আমার হাতের ভেতর তনুশ্রীর হাত, ও এখনো ঘুমিয়ে
!
খুব কাছেই হিংস্র প্রানিগুলির করুণ সুর শুনতে পাচ্ছি,
এদেরকে শুধু শব্দের মাধ্যমেই চেনা যায়, বর্ণণা দেয়া যায় শুধু তাদের শব্দ শুনে ! যখনি করুণ শব্দ শুনতে পাচ্ছি চোখের সামনে হিংস্র প্রানির অবয়ব ভেসে উঠছে !
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বুঝতে পারলাম
– করুণ শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসছে !
প্রানিগুলিকে আমি চোখে দেখিনি, তাই শব্দ শুনেই সবটুকু অনুমান, আর সেজন্যই মনে
হচ্ছে যে শব্দ নিজেই
হেঁটে হেঁটে কাছে আসছে, কোন প্রানি নয় !
তারা চলে এসেছে, করুণ শব্দগুলি, হিংস্র প্রানিগুলি !
আমি অনেক ক্লান্ত, তাই চোখ মেলার শক্তিটুকুও নেই ! তবে শব্দ অনুমান করে বুঝতে পারছি যে হিংস্র প্রানিগুলি
আশেপাশের ঘুমন্ত মানুষগুলিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে, মানুষগুলি কোন প্রতিবাদ ও করছে না,
কারণ তারা ঘুমিয়ে আছে ! আমি আগেই বলেছিলাম – ঘুমন্ত মানুষকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়া অনেক সহজ, অনেক আরামের !
কোন প্রানি এখনও আমাদের কাছে আসেনি, তারা ওদিকের ঘুমন্ত মানুষগুলিকে সাবাড় করছে !
আমি ভয় পাচ্ছি না,
কারণ আমি তনুশ্রীর হাত ধরে আছি, নিরাপদ অনুভব করছি ! তনুশ্রীর হাত অনেক ঠান্ডা মনে হচ্ছে, আমার হাত একটু গরম ওর তুলনায়, আর
তাই ঠাণ্ডা-গরম মিলে দারুণ অনুভূতি হচ্ছে আমার হাতের মধ্যে, শরীরের মধ্যে, মনের মধ্যে !
আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, আরামে, তনুশ্রীর হাতে হাত রেখে, নিজেকে নিরাপদ ভেবে !
অংশ ৫
রোদের শব্দ শুনতে পাচ্ছি,
সমুদ্রের শব্দ শুনতে পাচ্ছি,
উড়ে যাওয়া পাখির শব্দ শুনতে পাচ্ছি !
বুঝে ফেললাম, সকাল হয়েছে ! চোখ খুললাম, সাথে সাথে চোখ ধাঁধিয়ে গেল – সূর্যের আলোতে !
এখনও তনুশ্রীর হাত আমার হাতের ভেতরে ! তবে হাতটি গতকালের তুলনায় অনেক বেশি ঠাণ্ডা !
পাশ ফিরে তাকালাম, ও ঘুমিয়ে আছে,
এখনও !
ওর তনুশ্রী নামটা
আর ওর সাথে মানাচ্ছে
না, কারণ ওর শরীরের অর্ধেকের
বেশি অংশ নেই, পেটের দিকে কিছুই নেই – পুরো খালি, বুকের ভেতর কলজে-হৃদপিন্ড থাকার কথা, সেখানটা ফাঁকা বোতলের মত হয়ে আছে,
পাঁজরের হাড্ডি দেখা যাচ্ছে, মেরুদণ্ডসহ কশেরুকাও দেখা যাচ্ছে, সবই টকটকে লাল !
বুঝতে পারলাম, কাল রাতেই তনুশ্রীকে হিংস্র প্রানিগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে, তখন আমি ওর হাত ধরে
ঘুমুচ্ছিলাম ! এতটুকুও বুঝতে পারলাম না আমি, এতটাই
নির্বোধ আমি ?
তনুশ্রী ঠিকই বলত, “শুধু নিজেকে রক্ষা করতে জান তুমি, অন্যকে নয়, এমনকি আমাকেও নয় !”
এখনও অবশ্য ওর হাত নিজের
মুঠিতে শক্ত করে ধরে আছি ! ছাড়ব না এক দণ্ডের
জন্যও !
তনুশ্রী আছে অর্ধেক দেহ নিয়ে, ওর হাতটুকু আমার
মধ্যে রেখে দিয়ে ! বাকিটা হিংস্র প্রানিদের পেটে !
গত তিন দিন
ধরে না খেয়ে আছি,
খুব বেশি খিদে লাগছে ! এতটাই দুর্বল যে, ক্ষুধা মেটানোর শক্তিটুকুও নেই !
পাশেই তনুশ্রী, প্রায় পুরোটা কংকাল হয়ে, কংকাল এর শরীরে ছিটে-ফোঁটা লাল মাংস লেগে আছে ! তবে আমি ওর যে হাতটি
ধরে আছি, তা সম্পূর্ণটুকুই আছে,
পুরো আস্ত একটা হাত ! আমি হাতটা ধরে রেখেছিলাম বলেই হিংস্র প্রানিগুলি তা খায়নি ! তাহলে
কি আমি যদি তনুশ্রীকে সম্পূর্ণটা জড়িয়ে রাখতাম তাহলে কি হিংস্র প্রানিগুলি
ওকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেত না? ও বেঁচে থাকত
? তাহলে ও কি এই
সময়ে আমার সাথে গল্প করত ? আমি কি তখন ওর
দিকে তাকিয়ে ওর রূপ গিলে
গিলে খেতাম ?
শুধু হাত না ধরে ওকে
পুরোটা জড়িয়ে রাখলে অনেক কিছুই হত......যা এখন শুধুই
কল্পনায় আছে ! “ইশ” এর মধ্যে আছে
!
এদিকে আমার ক্ষুধা বেড়েই চলেছে ? কি করব ?
পাশে তাকালাম, তনুশ্রী আছে, ওর মুখের সম্পূর্ণ
মাংসটুকু আছে, গালে আছে, ঠোঁটে আছে ! আর কিছু না
ভেবে তনুশ্রীর ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিলাম, ছিঁড়ে নিলাম উপরের ঠোঁটটুকু, তারপর চিবাতে লাগলাম ! স্বাদ কেমন, তা জানি না,
তা বোঝার ক্ষমতা নেই আমার ! কোনভাবে খেতে পারলেই হল !
উপরের ঠোঁট চিবানো শেষ, গিলে ফেললাম, তারপর ওর নীচের ঠোঁটে
কামড় বসালাম, ছিঁড়ে নিয়ে চিবাতে থাকলাম !
তনুশ্রীর সাদা দাঁত গুলি এখন দেখা যাচ্ছে, ঠোঁট নেই যেহেতু !
যে ঠোঁটে আমি
চুমু খেয়েছিলাম গত তিন দিন
আগে আর আজ সেই
ঠোঁট চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছি !
তনুশ্রী জানলে আমাকে কখনই ওর ঠোঁট স্পর্শ
করতে দিত না, বলত, “একদিন তো দিব্যি চিবিয়ে
ফেলবে আমার ঠোঁট গুলি, তাহলে এখন কেন চুমু খেতে চাচ্ছ ? দিব না ! একদম না, এ কিন্তু কড়া
বারণ আমার ! মনে রেখ সৃষ্টি!”
তবে ও আমায় কখনোই
বারণ করেনি ঠোঁটে চুমু খেতে, যখনই চেয়েছি তখনই নিজের পাপড়ি নামিয়ে ঠোঁট দুটোকে উৎসর্গ করে দিয়েছে,
আর আজও যখন
আমি ক্ষুধার্থ, তখন সে নিজের ঠোঁট
দুটিকে উৎসর্গ করল, আর আমি হিংস্রের
মত ছিঁড়ে খেয়ে নিলাম !
সন্ধ্যা হয়ে এল, সূর্য সাগরে চুমু খেয়ে সাগরের গভীর নীলের ভেতর ডুব দিল !
আমি তনুশ্রীর হাত ধরে শুয়ে আছি আর ওর শরীরের
ওপর বন্য মাছি ভনভন করছে ! বেশ ক’বার তাড়ানোর
চেষ্টা করছি ! আর তাড়িয়েও বা
কি হবে ? যদিও আমার শরীরে সেই শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই !
অংশ ৬
এখন পুরোপুরি রাত ! চাঁদ
নেই, কিন্তু দূরের চাঁদগুলি আলো জ্বেলে রেখেছে ! আর তাতেই আমি
আমার ক্ষুধা মেটানো তনুশ্রীকে দেখতে পাচ্ছি !
যেহেতু ঠোঁট নেই সেহেতু ছোট ছোট বিষাক্ত পোকামাকড়গুলি ওই জায়গায় গোল
করে বসে আছে, ঘুরঘুর করছে, মাঝে মাঝে কামড় দিয়ে ঠোঁটের পাশে গালের মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে !
চোখের অংশটুকু ভায়ানক রূপ ধারণ করেছে ! বড় বড় লাল
পিঁপড়ে সেখানে পাপড়ি খুবলে খুবলে খাচ্ছে !
তনুশ্রীকে চুমু খাওয়ার সময় যে পাপড়ি দুটি
ওর চোখ ঢেকে রাখত, সেই পাপড়ি এখন পিঁপড়ের পেটে যাচ্ছে !
খুব এবং গভীরভাবে খুব বেশি অসহায় লাগছে এসব ভেবে !
আর কিছু ভাবতে
চাচ্ছি না, এখন আমি ঘুমাব, তনুশ্রীর হাত নিজের মুঠিতে নিয়ে, অন্তত এই হাতকে যেন
অন্য কেউ নিজের পেটে নিতে না পারে !
শেষমেশ ঘুমিয়ে পড়লাম, এই ভেবে নিশ্চিন্ত
হয়ে যে - আমি তনুশ্রীর হাত ধরে আছি আর ও পাশেই
আছে !
অংশ ৭
হঠাৎ করেই মনে হল, কেউ আমার পেটের সব কিছু টেনে
নিয়ে যাচ্ছে ! ব্যথা পাচ্ছি না মোটেও, ভোঁতা
অনুভূতি !
ঘুমুচ্ছিলাম, তার মধ্যেই এমন ধরণের অনুভূতি হচ্ছে !
ঘুম ভেঙে চারপাশে তাকালাম, একদম কাল রং এর জমাট
বাঁধা অন্ধকার ! তবে হালকা একটু সবুজ আলো আছে ! অনেক গুলো জোনাকি নিঃশব্দে উরে বেড়াচ্ছে, ওরা জানে যে তনুশ্রী ঘুমুচ্ছে,
তাই ওড়ার সময় একফোঁটা শব্দ করছে না ! যদি ওদের আলোর শব্দে বা ডানা ঝাপটানোর
শব্দে তনুশ্রী জেগে যায়, এই জন্য !
চুপচাপ উড়ে বেড়াচ্ছে আর রাস্তার ধারের
সিগ্ন্যাল লাইটের মত করে বিরতি
দিয়ে সবুজ আলো জ্বেলে যাচ্ছে !
হঠাৎ করেই চোখ পড়ল আমার শরীরের উপরের অংশে ! সেখানে ৩ জোড়া আলো
জ্বলছে ! এই আলো গুলি
কেমন যেন হিংস্র ধরণের ! এই আলোতে থাকার
চেয়ে না থাকাই ভাল
!
নিঃশব্দে কয়েকটা কয়েকটা নিঃশ্বাস নেয়ার পর পুরো ব্যাপারটা
বুঝলাম !
হিংস্র প্রানিগুলি আমার পেটের অংশ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে ! ওরা মোট ৩ টা প্রানি
! তাই ৩ জোড়া চোখ
!
এতে আমার কোন রকম কষ্ট হচ্ছে না, তবে কেমন যেন একটা ভোঁতা অনুভূতি !
ওরা যে আমার পেট
ছিঁড়ে খাচ্ছে তার কিছুই বুঝতে পারছি না আমি ! তবে
মনে হচ্ছে যে, পেটের নাড়িভুঁড়ি নিয়ে কেউ খেলা করছে, নাড়াচাড়া করছে ! আর কিছুই না
!
খুব ভয়ানক কষ্টের ঘটনা ঘটছে এখন, আমার নাড়িভুঁড়ি প্রানিগুলির পেটে যাচ্ছে ! তার মানে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তনুশ্রীর মত হয়ে যাব
!?
কিন্তু আমি কষ্ট পাচ্ছি না কেন ?! প্রানিগুলি
যা করছে আমার শরীর নিয়ে তাতে তো আমার গগনবিদারি
চিৎকার দেয়া উচিৎ ! কিন্তু তা ও আমি
করছি না !
তাহলে ?
ওহ ! এখন বুঝতে পারলাম, তনুশ্রীর হাত ধরে আছি বলে ! তাই কি কারণ টা
?!
জানি না ঠিক !
অংশ ৮
রাতের আকাশের মেঘ হয় ধূসর রঙের
!
চাঁদের সাদা আর রাতের কাল
সমপরিমাণে মিশে এই ধূসর বানায়
! তারপর মেঘ আর আকাশের মাধ্যমে
এই ধূসর প্রকাশ পায় !
এখন অবশ্য সেই ধূসরই আমি দেখছি ! আশেপাশে অনেক জোনাকি উড়ছে ! সিগ্ন্যাল দিচ্ছে একে অপরকে ! হয়তোবা, প্রেম করার জন্য অন্যকে ইঙ্গিত দিচ্ছে !
খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলে ওদের পাখার ফরফর শব্দ পাওয়া যায়, আরও একফোঁটা বেশি মনোযোগ দিলে ওদের জ্বালা সবুজ আলোর গল্প শোনা যায় ! আরও দুফোঁটা চুপ করে থাকলে ওদের নিজেদের গল্প শোনা যায় !
এর বেশি আর
চুপ করে থাকা যায় না, কারণ তিন ফোঁটা চুপ করলেই তা মৃত্যুর সমান
!
এমন করেই রাত চলছে ভোরের দিকে !
হিংস্র প্রানিগুলি আমার পেটের সব কিছু সাবাড়
করেছে ! আর এখন আমার
বুকের ভেতের খাবার খুজছে ! স্পষ্ট বুঝতে পারছি, হিংস্র প্রানির দাঁত গুলি আমার মধ্যচ্ছদা ছিঁড়ছে !
তারপর,
হঠাৎ করেই একটা প্রানি আমার কলিজায় কামড় বসাল আর আমি তনুশ্রীর
হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম !
