শৈশবের গুনাগুনি
ছোটকালে জানালা দিয়ে তাকালেই বাস-ট্রাকের হুহু
করে ছুটে চলা দেখতাম ! আমাদের ১৩ নাম্বার বাসাটি ছিল আইডিয়াল স্কুলের একদম বিপরীত মোড়ের
দিকেই ! আশেপাশে আরও অনেক স্কুল-কলেজ-হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল ! তাই সারাদিনই
প্রায় বাস-ট্রাকের ছুটাছুটি চলত ! একবার ইচ্ছে হয়েছিল, এই শহরের সব বাস-ট্রাক গুণে
ফেলব ! তাই স্কুল ছুটির একদিন সকালবেলায়, নাস্তা সেরে জানালার পাশে আয়েশ করে বসলাম,
জানালার শিকে গাল ঠেস দিয়ে, চিবুক দিয়ে হাতের উপর ভর দিয়ে শুরু করলাম গোনা, ১ ২ ৩ ৪
৫……৭৭ ৭৮ ৭৯………১৪৩ ১৪৪……২৯৭ ২৯৮ ২৯৯……
চলতেই থাকল, থামেই না !
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছ কি সাত’শ-এর
মত গুনেছিলাম ! পরে থামিয়ে দেই গোনা, কারণ ‘ইউটার্ন’ নামক একটা “আজব”
ব্যাপারের কথা মনে পড়ে গেল ! সেই ছোটকালে ইউটার্নকে আজব বলার কারণ হচ্ছে একবার রাস্তার
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখলাম – একটি নীল রঙের গাড়ি দীর্ঘ পথ পার করে এসে আবার
সাঁই করে ইউটার্ন নিয়ে সেই একই পথে উল্টা দিকে যাওয়া শুরু করল ! খুব অবাক হয়েছিলাম
তা দেখে ! মনে মনে নীল গাড়ির ড্রাইভারটিকে বোকা ভাবলাম ! পরে খালামণির কাছ থেকে জানতে
পারলাম ইউটার্ন নেয়ার আসল কাহিনী !
অতএব, গুনতে গুনতে মনে হল বাস-ট্রাকগুলি খুব দূরের
কোথাও ইউটার্ন নিয়ে আবার আমার সামনের রাস্তাতেই আসছে আর আমি বোকার মত একই গাড়িকে বারবার
গুণে যাচ্ছি !
অবশ্য ইউটার্ন না থাকলেও আমি গুণে শেষ করতে পারতাম
না বাস-ট্রাকের সংখ্যা ! কারণ গাড়িগুলি গন্তব্য একমুখী নয়, দুমুখী ! ওপারে ভালবাসা
নিয়ে যায়, আবার এপারেও ভালবাসা নিয়ে আসে ! মানুষগুলি হচ্ছে এক একটি করে ভালবাসা ! আর
আমার বাসাটাও ছিল শহরের একদম মধ্যিখানে, এপার বা ওপার, যে পারেই যেতে হউক না কেন, আমার
বাসার সামনে দিয়ে যেতে হবে !
২
এখন বড় হয়েছি, ভার্সিটিতে যাই, গাল-চিবুক কুচকুচে
কালো রঙের খশখশে দাঁড়ি দিয়ে ভর্তি ! ১৩ নাম্বার বাসাটাও পাল্টানো হয়েছে, এখন থাকি ৯০
নাম্বার বাসার ৪র্থ তলায়, তাই আকাশ খানিকটা কাছেই বলা চলে ! এই বাসাটি কলোনির একদম
মধ্যিখানে, তাই জানালা দিয়ে তাকালে বাস-ট্রাক দেখা যায় না ! দেখা যায় আকাশ !
এখনও ছোটকালের অভ্যাসটা গেল না ! দিনের বেলা আকাশের
দিকে তাকিয়ে প্রথমে সূর্য গুনি, তারপর মেঘ গোনা শুরু করি ! সুর্য একটাই, তাই গুণে ফেলতে
পারি সহজে ! কিন্তু মেঘ ?! এগুলি তো বদের হাড্ডি, মাঝে মধ্যে একটি থেকে কয়েকটি হয়ে
যায় চোখের সামনেই !
আর রাতের বেলা ?! প্রথমে চাঁদ গুনি, কেবল একটা
চাঁদ !
তারপর গুনি তারা ! এর সংখ্যা অসংখ্য হলেও গুনে
শেষ করতে পারি ! কারণ এই শহরে আলো দূষণ হয়, তাই তারার সংখ্যাটাও একদম হাতে গুনে ফেলার
মত !
যদিও চাঁদ এবং সূর্য একটা করেই ! তবুও কেন যেন
গুণতে ভাল লাগে !
যে জিনিস একটা – তা কি গুনব না ?! নিষেধ আছে নাকি
?